বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশেই ডেঙ্গু এখন একটি বড় স্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে বর্ষাকালে এ রোগের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। ডেঙ্গু ভাইরাস বাহিত মশা কামড় দিলে মানুষের শরীরে সংক্রমণ ঘটে এবং এতে মারাত্মক জ্বর ও নানা ধরনের শারীরিক জটিলতা দেখা দিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রেই এটি প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। তাই ডেঙ্গু মশা সম্পর্কে জানা, এটি চেনার উপায়, এর বিস্তার কিভাবে ঘটে, কীভাবে প্রতিরোধ করা যায় এবং যদি কেউ আক্রান্ত হয় তাহলে কী করণীয়—এসব বিষয়ে বিস্তারিত জানা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

ডেঙ্গু মশা কী?

ডেঙ্গু মশা বলতে সাধারণত Aedes aegypti এবং Aedes albopictus মশাকে বোঝানো হয়। এরা ডেঙ্গু ভাইরাস বহন করে এবং সংক্রমণের প্রধান মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। এই মশাগুলো মূলত উষ্ণ ও আর্দ্র পরিবেশে দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে। শহরাঞ্চলে অপরিচ্ছন্ন স্থান, বদ্ধ পানি, এবং ঝোপঝাড় এদের বসবাসের আদর্শ জায়গা। Aedes মশা সাধারণত দিনে কামড়ায়, বিশেষ করে সকালে সূর্য ওঠার পর এবং বিকেলে সূর্যাস্তের আগে তাদের কার্যক্রম বেশি থাকে।

 ডেঙ্গু মশা কোথায় জন্মায়?

ডেঙ্গু মশা মূলত পরিষ্কার ও স্থির পানিতে ডিম পাড়ে। এটি সবচেয়ে বড় একটি সমস্যা কারণ আমাদের চারপাশেই এমন অনেক স্থান থাকে যেখানে অল্প পরিমাণে পানি জমে থাকে এবং সেখানেই মশার লার্ভা জন্ম নিতে পারে। কিছু সাধারণ স্থান যেখানে ডেঙ্গু মশা জন্ম নিতে পারে তা হলো:

  • ফুলের টবের নিচে জমে থাকা পানি
  • ভাঙা বোতল বা ক্যান
  • প্লাস্টিক বা টায়ারের ভেতরে জমে থাকা পানি
  • পানির ট্যাংক বা ড্রামের ঢাকনা খোলা থাকলে
  • এসির নিচে জমে থাকা পানি
  • ফ্রিজের নিচে পানির ট্রে
  • অপরিষ্কার ছাদ ও নর্দমার পাশে জমে থাকা পানি

ডেঙ্গু মশা কখন কামড়ায়?

অনেকেই মনে করেন মশা শুধু রাতে কামড়ায়, কিন্তু ডেঙ্গু মশার ক্ষেত্রে এটি ভুল ধারণা। Aedes মশা সাধারণত দিনের বেলা কামড়ায়, বিশেষ করে সকাল ৮টা থেকে ১১টা এবং বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে এদের কামড়ানোর প্রবণতা সবচেয়ে বেশি থাকে। এই সময়ে বাড়ির ভেতরে এবং বাইরে থাকা মানুষ বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকে।

ডেঙ্গু মশা কামড়ানোর লক্ষণ ও জ্বর হওয়ার সময়কাল

ডেঙ্গু মশার কামড়ানোর পর সংক্রমণ শুরু হলেও সাথে সাথেই উপসর্গ দেখা দেয় না। সাধারণত ডেঙ্গু ভাইরাস মানবদেহে প্রবেশ করার পর ৪ থেকে ৭ দিনের মধ্যে লক্ষণ প্রকাশ পেতে শুরু করে, তবে কিছু ক্ষেত্রে ৩ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এই সময়কে Incubation Period বা সংক্রমণকাল বলা হয়।

ডেঙ্গু রোগের লক্ষণগুলো সাধারণত চারটি ধাপে প্রকাশ পায়:

১. প্রাথমিক লক্ষণ (১ম – ৩য় দিন)

ডেঙ্গু জ্বরের শুরুতে শরীরের তাপমাত্রা হঠাৎ করেই বেড়ে যায়, যা ১০৩-১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত উঠতে পারে। অনেক ক্ষেত্রেই এই জ্বর সহ্য করা কঠিন হয়ে পড়ে। এর সাথে সাধারণত দেখা দিতে পারে—

  • প্রচণ্ড মাথাব্যথা
  • চোখের পেছনে ব্যথা
  • শরীরে তীব্র ব্যথা (যাকে “Breakbone Fever” বলা হয়)
  • ত্বকে র‍্যাশ বা লালচে দাগ
  • ক্ষুধামন্দা
  • ক্লান্তি ও দুর্বলতা

২. মধ্য পর্যায়ের লক্ষণ (৪র্থ – ৫ম দিন)

এই পর্যায়ে শরীরের প্লাটিলেট সংখ্যা কমতে থাকে এবং শরীর আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। রোগী খুব বেশি দুর্বল বোধ করতে পারে এবং জ্বর কমতে শুরু করলেও শরীরে তীব্র ব্যথা ও অস্বস্তি থাকতে পারে। এ সময় দেখা দিতে পারে—

  • হালকা থেকে মাঝারি রক্তপাত (নাক, মাড়ি থেকে)
  • ত্বকে লাল দাগ বা ফুসকুড়ি
  • পেটে ব্যথা ও ডায়রিয়া
  • বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া

৩. জটিল অবস্থা (৬ষ্ঠ – ৭ম দিন)

অনেক ক্ষেত্রে ডেঙ্গু ভয়ানক রূপ নিতে পারে, বিশেষ করে ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার (DHF) বা ডেঙ্গু শক সিনড্রোম (DSS) হলে রোগীর অবস্থা মারাত্মক হয়ে যেতে পারে। তখন নিম্নলিখিত লক্ষণগুলো দেখা দিতে পারে—

  • চামড়া ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া
  • রক্তচাপ কমে যাওয়া
  • শ্বাসকষ্ট হওয়া
  • বমির সাথে রক্ত আসা
  • ব্লিডিং বেশি হওয়া
  • চরম দুর্বলতা ও অজ্ঞান হয়ে যাওয়া

৪. সুস্থতার ধাপ (৮ম – ১০ম দিন)

যদি রোগী জটিল অবস্থায় না পৌঁছায়, তাহলে ধীরে ধীরে প্লাটিলেট সংখ্যা বাড়তে থাকে, শরীরে রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক হয় এবং রোগী সুস্থ হতে শুরু করে। তবে, সম্পূর্ণ সুস্থ হতে অনেকের ক্ষেত্রে ২-৩ সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

ডেঙ্গু মশা কামড়ানোর পর করণীয়

যদি কেউ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

১. প্রচুর পরিমাণে তরল পান করুন

ডেঙ্গু হলে শরীরে পানিশূন্যতা তৈরি হতে পারে। তাই পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি, ডাবের পানি, ওরস্যালাইন এবং তরল খাবার গ্রহণ করতে হবে। শরীরে পানির ঘাটতি হলে রোগীর অবস্থা আরও খারাপ হতে পারে।

২. প্যারাসিটামল খেতে পারেন, কিন্তু অ্যাসপিরিন নয়

ডেঙ্গু জ্বর হলে ব্যথা ও জ্বর কমানোর জন্য শুধুমাত্র প্যারাসিটামল (Paracetamol) ব্যবহার করা নিরাপদ। তবে, কোনওভাবেই অ্যাসপিরিন (Aspirin) বা আইবুপ্রোফেন (Ibuprofen) ব্যবহার করা যাবে না, কারণ এগুলো রক্ত পাতলা করে এবং অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়ায়।

৩. পূর্ণ বিশ্রাম নিন

ডেঙ্গুতে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে, তাই পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। যদি পর্যাপ্ত বিশ্রাম না নেওয়া হয়, তাহলে সুস্থ হতে বেশি সময় লাগতে পারে।

৪. রক্ত পরীক্ষা করান

ডেঙ্গু শনাক্তের জন্য NS1 Antigen Test, IgM, এবং IgG টেস্ট করা হয়। এছাড়া প্লাটিলেট কাউন্ট পর্যবেক্ষণ করাও জরুরি।

৫. জ্বর কমাতে ঠান্ডা পানির কাপড় ব্যবহার করুন

ডেঙ্গু হলে জ্বর বেশি থাকে, তাই শরীর ঠান্ডা রাখতে ভেজা কাপড় দিয়ে শরীর মুছতে হবে। তবে, বরফ বা খুব ঠান্ডা পানি ব্যবহার করা উচিত নয়।

ডেঙ্গু মশা প্রতিরোধের উপায়

কিছু কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিচে উল্লেখ করা হলো—

১. জমে থাকা পানি পরিষ্কার করা

  • ফুলের টব, ড্রাম, গাড়ির টায়ার, বোতল ইত্যাদি যেখানে পানি জমে থাকতে পারে, সেগুলো নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে।
  • এসির নিচে বা ফ্রিজের নিচের ট্রেতে পানি জমতে দিলে হবে না।
  • পানির ট্যাংক ও ড্রাম অবশ্যই ঢেকে রাখতে হবে।

২. কীটনাশক স্প্রে করা ও ফগিং করা

স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে মশা নিধনের জন্য নিয়মিত ফগিং করা হলে ডেঙ্গু মশার বিস্তার কমতে পারে। ব্যক্তিগতভাবে ঘরে কীটনাশক স্প্রে করাও উপকারী।

৩. ব্যক্তিগত সুরক্ষা গ্রহণ করা

  • মশারি টানিয়ে ঘুমানো
  • ঘরের জানালা ও দরজায় মশার জালি লাগানো
  • মশা নিরোধক লোশন ব্যবহার করা
  • হালকা রঙের ও ঢিলেঢালা পোশাক পরা

৪. জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা

ডেঙ্গু মশার প্রজনন বন্ধ করতে শুধু ব্যক্তি পর্যায়ে সচেতন হওয়া যথেষ্ট নয়, বরং পুরো সমাজকে সচেতন হতে হবে। স্থানীয় প্রশাসন, স্কুল, কলেজ, অফিস—সবখানেই প্রচারণা চালানো জরুরি।

ডেঙ্গু মশা নিধনের উপায়

ডেঙ্গু মশা নিয়ন্ত্রণে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও ব্যক্তি পর্যায়েও ব্যবস্থা নিতে হবে। নিম্নলিখিত পদ্ধতিতে ডেঙ্গু মশা দমন করা যায়:

  • বাড়ির চারপাশের ঝোপঝাড় কেটে ফেলা
  • ফুলের টব, পানির ট্যাংক ও গাড়ির টায়ার পরিষ্কার রাখা
  • কীটনাশক স্প্রে করা
  • স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে ফগিং কার্যক্রম পরিচালনা করা

ডেঙ্গু মশা সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

  • Aedes মশা সাধারণত ৪০০ মিটারের বেশি উপরে উড়তে পারে না।
  • একটি স্ত্রী মশা একবারে ১০০-২০০টি ডিম পাড়তে পারে।
  • মশার জীবনচক্র ৭-১০ দিনের মধ্যে সম্পন্ন হয়।
  • ডেঙ্গু মশার ডিম শুষ্ক অবস্থায় ৬ মাস পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে এবং পানি পেলেই ফোটে।

 

উপসংহার

ডেঙ্গু প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো ব্যক্তিগত ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা। আমরা যদি আমাদের চারপাশ পরিষ্কার রাখি এবং পানি জমতে না দেই, তাহলে ডেঙ্গু মশার বংশবৃদ্ধি কমানো সম্ভব।

আপনার সচেতনতাই পারে ডেঙ্গু মুক্ত পরিবেশ গড়ে তুলতে!

ডেঙ্গু মশা কামড়ালে কি চুলকায়?

হ্যাঁ, ডেঙ্গু মশা কামড়ালে সাধারণত সামান্য চুলকানি বা জ্বালাপোড়া অনুভূত হতে পারে, তবে এটি সাধারণ মশার কামড়ের মতো তীব্র নয়। এডিস মশার লালারস ত্বকের নিচে প্রবেশ করার ফলে কিছু মানুষের ত্বকে হালকা চুলকানি বা লালচে দাগ হতে পারে।

ডেঙ্গু মশা চেনার উপায় কি?

ডেঙ্গু মশা বা এডিস মশা চেনার জন্য কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য রয়েছে—

  • শরীরে কালো ও সাদা ডোরা দাগ থাকে।
  • এরা সাধারণত সকাল এবং সন্ধ্যার সময় বেশি সক্রিয় থাকে।
  • এই মশা সাধারণত পরিষ্কার জমে থাকা পানিতে ডিম পাড়ে, যেমন ফুলের টব, গাড়ির টায়ার, কুলার বা খোলা পানির পাত্রে।
  • এডিস মশা খুব দ্রুত ও নীরবে উড়ে এবং কামড়ানোর সময় ধীরে ধীরে বসে।

ডেঙ্গু মশা কামড়ানোর কতক্ষণ পর জ্বর হয়?

ডেঙ্গু মশার কামড়ানোর পর সরাসরি জ্বর হয় না। সাধারণত ভাইরাস শরীরে প্রবেশের পর ৪-৭ দিনের মধ্যে জ্বরের লক্ষণ দেখা দেয়, তবে কিছু ক্ষেত্রে এটি ৩-১৪ দিনের মধ্যে হতে পারে। এই সময়কে Incubation Period বলা হয়।