ভাবুন তো, একটি ছোট্ট মশা কীভাবে আপনাকে কিংবা আপনার প্রিয়জনকে হাসপাতালে পাঠিয়ে দিতে পারে? হ্যাঁ, এডিস মশা ঠিক তাই করছে! এই মশার কামড়েই ছড়িয়ে পড়ছে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া ও জিকা ভাইরাসের মতো ভয়ংকর রোগ। বাংলাদেশে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়, হাসপাতালগুলো রোগীতে ভরে যায়, এমনকি অনেক প্রাণহানি ঘটে।
অথচ একটু সচেতন হলেই এডিস মশার বিস্তার প্রতিরোধ করা সম্ভব! কিন্তু কীভাবে? এডিস মশা কোথায় জন্মায়? কীভাবে এটি আমাদের জন্য হুমকি হয়ে উঠছে? এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ- কীভাবে এডিস মশার প্রতিকার করতে পারি? তাহলে আসুন, এডিস মশা ও তার প্রতিকার সম্পর্কে জেনে নিই।
এডিস মশা কি?
একটি ছোট্ট মশা, কিন্তু এর প্রভাব ভয়াবহ! এডিস মশা এমন একটি মশা যা আমাদের দিনচক্রে অনেক বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে। আপনি ভাবছেন, একটা মশা কি আর কী করবে? কিন্তু জানেন কি, এডিস মশা বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর মশার মধ্যে একটি, কারণ এটি অনেক মারাত্মক রোগের বাহক!
২০০০ সাল থেকে দেশে ডেঙ্গু রোগের প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর, আমরা সবাই কমবেশি এডিস মশা এবং তার এডিস এজিপটি ও এডিস এলবোপিকটাস প্রজাতির সাথে পরিচিত।
এডিস মশা কেবল ডেঙ্গু নয়, বরং ম্যালেরিয়া, চিকুনগুনিয়া, পীত জ্বর, জিকা ভাইরাস, এমনকি জাপানিজ এনসেফালাইটিস ও লিম্ফ্যাটিক ফিলারিয়াসিস—এই সব রোগের বাহক। তাই, এর কামড় ছোট হলেও এর ক্ষতি অনেক বড় হতে পারে!
এডিস মশা কোথা থেকে কিভাবে এলো?
একবার ভাবুন তো, এই এডিস মশা কীভাবে আমাদের জীবনে জায়গা করে নিয়েছে? সবকিছুই শুরু হয়েছিল আফ্রিকার এক ছোট্ট জায়গা থেকে। সেখানে, গাছের কোটর, বাঁশের গোঁড়া, কিংবা পাতার বোটা-এইসব জায়গায় বৃষ্টির পানি জমলেই এডিস মশা ডিম পাড়ত। বর্ষাকালে অতিরিক্ত আদ্রতা তাদের বংশবৃদ্ধির জন্য আদর্শ পরিবেশ সৃষ্টি করে, এবং বৃষ্টির পানি শুকিয়ে গেলেও তাদের ডিম বছরের পর বছর বেঁচে থাকে!
মজার বিষয় হলো, আফ্রিকার এসব মশা একসময় বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে ইউরোপীয় উপনিবেশ স্থাপনকারীদের মাধ্যমে, জাহাজে করে, এবং আজকের দিনে বিশ্বব্যাপী পরিবহন ব্যবস্থার মাধ্যমে এই মশা এক দেশ থেকে আরেক দেশে ছড়িয়ে পড়ছে।
এডিস মশা দেখতে কেমন?
কখনো কি লক্ষ্য করেছেন সাদা-কালো ডোরাকাটা মশাকে? হ্যাঁ, ঠিক বলছেন, এটি এডিস মশা, যা আমাদের দেশে টাইগার মশা নামে পরিচিত। এর দেহে রয়েছে সাদা-কালো ডোরাকাটা দাগ, যা একে অন্যান্য মশার থেকে আলাদা করে তোলে। মজার ব্যাপার হলো, এডিস মশা প্রায়শই মাঝারি আকারের হয় এবং এর অ্যান্টেনা বা শুঙ্গের মতো অংশ লোমশ দেখা যায়।
অদ্ভুতভাবে, পুরুষ মশার অ্যান্টেনা স্ত্রী মশার তুলনায় বেশি লোমশ হয়!
এডিস মশা কোথায় জন্মায়?
আপনার বারান্দার এক কোণে রাখা ফুলের টবে বা ছাদে পড়ে থাকা প্লাস্টিকের বোতলে একটু পানি জমে আছে। খুব সাধারণ ব্যাপার, তাই না? কিন্তু জানেন কি, এই সামান্য জমে থাকা পানিই হয়ে উঠতে পারে শত শত এডিস মশার জন্মস্থান!
এই মশার জন্মযাত্রা শুরু হয় ছোট্ট একটি ডিম থেকে। বর্ষাকালে কিংবা আর্দ্র পরিবেশে, এডিস মশা ডিম পাড়ে যে কোনো স্বচ্ছ জমে থাকা পানিতে-হোক তা একটি চিপসের প্যাকেট, ফ্রিজের নিচের ট্রে, বা অব্যবহৃত কমোডের কোণে জমে থাকা জল।
মজার ব্যাপার হলো, পানি শুকিয়ে গেলেও এই ডিমগুলো মরে না! তারা একেবারে ঘুমিয়ে থাকে, যেন সুযোগের অপেক্ষায় আছে। আর একবার বৃষ্টি এলেই? সঙ্গে সঙ্গে সক্রিয় হয়ে ফুটে বের হয় ছোট্ট লার্ভা, যা দ্রুতই পরিণত হয় ভয়ংকর ডেঙ্গুবাহিত এডিস মশায়!
এডিস মশা কখন কামড়ায়?
এক সময় সবাই ভাবতো এডিস মশা শুধু দিনের বেলা কামড়ায়, তবে এখন আর সেই ধারণা সঠিক নয়। এডিস এজিপ্টি মশা আজকাল তার চরিত্রে পরিবর্তন নিয়ে এসেছে! সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, এই মশা দিন ও রাত-দুই সময়েই কামড়াতে পারে, বিশেষ করে যদি ঘরটি আলোকিত থাকে।
এডিস মশা কামড়ালে কি ডেঙ্গু হয়
এডিস মশা কামড়ালে যে ডেঙ্গু হবেই, এমন নয়। ডেঙ্গু জ্বরের ভাইরাস মশার মধ্যে তখনই ছড়াতে পারে, যখন মশাটি আগে থেকেই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়।
এডিস মশা সাধারণত একাধিক ব্যক্তিকে কামড়ায়, এবং যদি তার মধ্যে কেউ ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত থাকে, তবে মশাটি সেই ব্যক্তির শরীর থেকে ভাইরাস গ্রহণ করে। এরপর, যদি ওই মশা সুস্থ কাউকে কামড়ায়, তবে ভাইরাসটি তার শরীরে প্রবেশ করে এবং ডেঙ্গু হতে পারে।
অর্থাৎ, এডিস মশা নিজে থেকে ডেঙ্গু ছড়ায় না, বরং এটি তখনই বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, যখন এটি ডেঙ্গু ভাইরাস সংক্রমিত হয়।
এডিস মশা কামড়ালে কখন জ্বর আসে?
আমরা জানি, ডেঙ্গু জ্বর ছড়ায় এডিস মশা বা ডেঙ্গু মশার মাধ্যমে। কিন্তু আপনি কি জানেন, এই মশা কামড়ালেই জ্বর আসে না?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এডিস মশা কামড়ানোর পর পাঁচ থেকে সাত দিন সময় লাগে ডেঙ্গু রোগের লক্ষণ প্রকাশ পেতে, আর এই সময়কে বলা হয় ইনকিউবেশন পিরিয়ড।
মেডিকেল বিশেষজ্ঞরা বলেন, এডিস মশা কামড়ানোর পর পাঁচ থেকে সাত দিনের মধ্যে আপনার শরীরে জ্বর দেখা দিতে পারে। আর এই জ্বর থাকতে পারে পাঁচ থেকে ছয় দিন পর্যন্ত।
এডিস মশা প্রতিরোধের উপায়
ডেঙ্গু প্রতিরোধ করা সম্ভব, কিন্তু এর জন্য আপনাকেই কিছু ব্যবস্থা নিতে হবে!
১.চারপাশ পরিষ্কার রাখুন
আপনার বাড়ির আশেপাশে কোথাও পানি জমে আছে কি না খেয়াল করুন-বারান্দার ফুলের টবে পানি জমে আছে?বৃষ্টির পর বাড়ির আশেপাশে পড়ে থাকা প্লাস্টিকের বোতল, ড্রাম, কিংবা পুরনো টায়ারে পানি জমেছে?ফ্রিজ, এসি বা বাথরুমের কোনো কোণে অজান্তেই পানি জমে থাকছে? যদি এর মধ্যে যেকোনো একটি সত্য হয়, তাহলে জানবেন-আপনার ঘরেই ডেঙ্গুর উৎস তৈরি হচ্ছে! এখনই এসব পরিষ্কার করুন!
২.সঠিক পোশাক পড়ুন
এডিস মশা সাধারণত দিনের বেলাতেই কামড়ায়, তাই
লম্বা হাতার জামা ও ফুলপ্যান্ট পরুন, বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের জন্য এটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। হালকা রঙের কাপড় পরার চেষ্টা করুন, কারণ গাঢ় রঙের পোশাকে মশা বেশি আকৃষ্ট হয়! রেপেলেন্ট ব্যবহার করুন – কিন্তু বুঝেশুনে! আজকাল পার্মেথ্রিনযুক্ত মশা প্রতিরোধী লোশন বা স্প্রে পাওয়া যায় যা ত্বকে লাগালে মশা দূরে থাকবে। তবে দুই মাসের কম বয়সী শিশুর ত্বকে এসব ব্যবহার করবেন না।
৪.মশারী টানিয়ে ঘুমান
ঘুমের সময় মশার হাত থেকে বাঁচুন!
আপনার ঘর বা কক্ষের জানালা খোলা বা দরজা দিয়ে এডিস মশা ঢুকতে পারে—এটা জানেন তো?
তাই, ঘুমানোর আগে মশারি টানানো অভ্যাস করুন।
ভ্রমণকালীন সতর্কতা – নিরাপদ থাকুন!
৪.ভ্রমণে সতর্কতা অবলম্বন করুন
আপনি যদি গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালে উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলে ভ্রমণ করেন, তবে কিছু বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ডেঙ্গু বেশি ছড়ায়, সুতরাং এসব এলাকাগুলোর ব্যাপারে সতর্ক থাকুন। ভ্রমণের আগে সুরক্ষা ব্যবস্থা নিন, যেমন মশা প্রতিরোধী স্প্রে বা লোশন ব্যবহার করা। ভ্রমণের পর শরীরের কোনো উপসর্গ দেখা দিলে অবশ্যই ডেঙ্গু পরীক্ষা করিয়ে নিন।
শেষকথা
এডিস মশা ভয়াবহ রোগের বাহক, যা আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। তবে, সচেতনতা এবং সঠিক প্রতিকার পদ্ধতির মাধ্যমে আমরা এই মশার উপদ্রব কমাতে পারি। ব্যক্তিগত সুরক্ষা, পরিবেশের পরিচ্ছন্নতা, এবং প্রশাসনিক পদক্ষেপের মাধ্যমে এডিস মশার বিরুদ্ধে লড়াই করা সম্ভব।আসুন, সবাই মিলে এডিস মশার বিরুদ্ধে একযোগে কাজ করি এবং আমাদের জীবনকে নিরাপদ রাখি।
Frequently Asked Question (FAQs)
১.এডিস মশা কোথায় কামড়ায়?
প্রচলিত ধারণা রয়েছে যে এডিস মশা কেবল পায়ে কামড়ায়, তবে এটি একদম সঠিক নয়! যদিও এ মশা সাধারণত পা কামড়ায়, কারণ পা অনেক সময় অনাবৃত থাকে, তবে এটি শরীরের যেকোনো জায়গায় কামড়াতে পারে।
এডিস মশা প্রধানত দিনের বেলা সক্রিয় থাকে এবং পায়ের পাশাপাশি হাত, কোমর, এবং অন্য কোনো অংশ থেকেও কামড়াতে পারে, যখন আপনার শরীরের সেই অংশগুলো খোলা থাকে।
২.এডিস মশার ডিম কীভাবে নষ্ট করবো?
এডিস মশার ডিম ধ্বংস করতে, প্রথমে পানিটি ফেলে দিন যেখানে মশা ডিম দিয়েছে। এছাড়া, পানিতে তেল, সাবান বা ভিনিগার মিশিয়ে ডিম ধ্বংস করা যায়। তেল পানি ঢেকে ফেললে ডিমের শ্বাস বন্ধ হয়, সাবান বা ভিনিগার ডিম নষ্ট করে। তাই, যত দ্রুত সম্ভব জমে থাকা পানি পরিষ্কার করুন এবং মশার বংশবৃদ্ধি প্রতিরোধ করুন।
৩.এডিস মশা কামড়ালে কি ফুলে যায়
হ্যাঁ, এডিস মশা কামড়ালে সাধারণত শরীরের অংশে ফোলাভাব দেখা যায়। মশার কামড়ের কারণে আমাদের ত্বকে হালকা লালচে ভাব এবং ফোলাভাব হতে পারে, যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে চুলকানি বা অস্বস্তি সৃষ্টি করে। এই প্রতিক্রিয়া সাধারণত মশার কামড়ের জন্য শরীরে হওয়া অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া।অবশ্যই, যদি কামড়টি খুব বেশি ফুলে যায় বা অস্বস্তি বাড়ে, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।